top of page
Search

ফুটবলপ্রেমীর ইতিবৃত্ত

  • Writer: Ayon Mukherjee
    Ayon Mukherjee
  • Nov 6, 2024
  • 4 min read

Updated: Feb 4, 2025


ইংরেজি উনিশশো ছিয়ানব্বই সনে আমার ঠাকুরদাদার মৃত্যু হয়। আমার তখন পাঁচ বছর বয়স।

আমার বাবা আমার ঠাকুরদাদার মৃত্যুতে যে দুঃখ পেয়েছিলেন, আমি তা'; দেখে থাকলেও; মনে করতে পারি না, আমার অপরিনত বয়সের কারণে।

ইংরেজি উনিশশো নিরানব্বই সনে যখন আমার ঠাকুমা মারা গেলেন; তখন বাবাকে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিলাম - শ্মশানঘাটে, ঠাকুমাকে দাহ করার পর।

তবে, সেটা আমার বাবাকে আমার দ্বিতীয়বার দুঃখ পেতে দেখা।


আমি আমার জীবনে আমার বাবাকে প্রথমবার দুঃখ পেতে দেখেছিলাম ঠাকুমার মৃত্যুর প্রায় এক বছর আগে - ইংরেজি উনিশশো আটানব্বই সনের ফুট্‌বল্ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল ফ্রান্সের কাছে হারস্বীকার করার পর। এখন বুঝতে পারি, বহমান সময়ের ওই একটি বিন্দুতে অনুভূত আবেগ আমার আর ফুট্‌বলের প্রেমকাহিনীর উৎস্য। সেই কাহিনীর পাতায় পাতা জুড়ে পুঁথি বেড়ে চলেছে আজও।


খেলাধূলার প্রতি অনুরাগ আমার ছোটবেলা থেকেই। দুরন্ত বাচ্চা ছিলাম, শান্ত-শিষ্ঠ-ল্যাজবিশিষ্ট ছিলাম না কোনোকালেই। মা আর বাবা, উভয়েই, উৎসাহিত করেছেন খেলার বিষয়ে। খেলেছেন আমার সঙ্গে। খেলা যতটা জানেন, শিখিয়েছেন। আড় ভেঙে, লজ্জা কাটিয়ে, খেলার মাঠে নতুন বন্ধুত্ব করতে বাধ্য করেছেন।

ইস্কুল থেকে শুরু 'করে পাড়া, বাড়ী থেকে শুরু 'করে; ছুটির সময়; মামাবাড়ী - সবজায়গায় খেলেছি আমি তাই। আর, খেলার মধ্যে ক্রিকেট্ আর ফুট্‌বল্ই ছিল প্রধান।


আগ্রহের কথা ভাবলে - স্মৃতির দলিল ঘেঁটে - দেখতে পাই, যে প্রথম দিকে ক্রিকেটেই আগ্রহটা ছিল বেশি। খেলতাম, দেখতাম, ভারতীয় ক্রিকেট্ দলের জন্য পাগল হতাম, সৌরভ গাঙ্গুলীর সাফল্যের কামনায় ভগবানের কাছে - তখনও নাস্তিকতা জন্ম নেয়নি মননে - প্রার্থনা করতাম।

ফুট্‌বল্ তখন ছিল শুধুমাত্র একটি অনুচিন্তা। তবু, উনিশশো আটানব্বইয়ের সেই ঘটনাবহুল রাত্রে ফুট্‌বলের প্রতি আমার অনুরাগ, ভালবাসা, ভক্তি ও আসক্তির বীজ বপন হয়েছিল; যদিও সে'কথা বুঝেছিলাম অনেক পরে।


'আটানব্বইয়ের বিশ্বকাপের উদ্যোক্তা দেশ ছিল ফ্রান্স।

ইউরোপীয় সময়ের সাথে ভারতীয় সময়ের পার্থক্যের কারণে ইউরোপের সন্ধ্যার খেলাগুলো ভারতে দেখা যায় মধ্যরাত্রের পর।

সাত বছর বয়সে - ইস্কুল চলাকালীন - রাত জেগে সেইসব খেলা নিয়মিত দেখার যে আমার অনুমতি ছিল না; সে কথা বলাই বাহুল্য! তাও, ফুট্‌বল্ বিশ্বকাপের ফাইনাল্ খেলাটার গুরুত্ব বাবার জীবনে - এমনকি মায়ের জীবনেও - এতটাই ছিল; যে আমায়, জীবনে প্রথমবার, তাঁদের সাথে রাত জেগে খেলা দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ব্রাজিলের সাথে ফ্রান্সের সেই খেলাটার তাৎপর্য্য; আমার কাছে; এই ব্যক্তিগত কারণেও অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল, নিঃসন্দেহে!


উনিশশো আটানব্বইয়ের তেরই জুলাইয়ের সেই রাত্রে; মা আর বাবার মাঝখানে, খাটে, আধশোয়া 'হয়ে আমাদের ছোট, সাদা-কালো দূরদর্শনে অসুস্থ্য রোনাল্দোর (উচ্চারণটা 'হোনাল্দো' হওয়া উচিৎ, কিন্তু পর্তুগিজ-ভাষাভাষী ব্যতীত নামটা প্রায় কেউ সঠিক উচ্চারণ করেন না) জঘন্য খেলার কারণে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ব্যর্থতা আর ফ্রান্সের দ্রুত প্রতিআক্রমণে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের অপারগতা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। খেলার অন্তিম পর্যায়ে দুই-গোলে পিছিয়ে পড়া, আক্রমণোন্মুখ ব্রাজিলের জনশূন্য রক্ষণভাগকে; সোনালী-চুল দুলিয়ে, বল্ পায়ে, সহজেই; পার 'করে ফরাসী ফরোয়ার্ড এমানুয়েল পেতির করা তৃতীয় গোলটার দৃশ্য আজও চোখে ভাসে আমার! ব্রাজিলীয় গোলরক্ষকের অসহায় অক্ষমতা, ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়দের বিজিত শরীরী-ভাষা, ব্রাজিলীয় সমর্থকদের আকুল কান্না আর আমার বাবার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখাবয়ব - আমার সাত-বছরের, কচি মনে; সেই ভোররাত্রে; দাগ কেটে যায় সবকিছু। আমি নিশ্চিৎ, আমার সরল মন সেদিন কিছু না বুঝলেও; আমার আত্মা সেদিন জেনেছিল ফুট্‌বলের সঙ্গে মানুষের কতখানি আবেগ জড়িয়ে থাকতে পারে!


পরদিন সকালে - ঘুমচোখে, অনিচ্ছাসত্ত্বে ইস্কুল যাওয়ার পথে - আমার কাঁচা মাথা হিসাব 'করে ঠিক করল: ব্রাজিল আমার বাবাকে দুঃখ দিয়েছে, তাই আমি ব্রাজিলকে সমর্থন করব না!

হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত 'হল। মনের মণিকোঠায় আর্জেন্তিনার স্থান পাওয়ার পথ প্রশস্ত 'হল।



২ । ১


আর্জেন্তিনীয়, লাতিন তথা বিশ্বফুট্‌বলের ইতিবৃত্ত একটু খুঁটিয়ে দেখলেই দেখা যাবে সেখানে স্বর্ণাক্ষরে একটি নাম খোদাই করা আছে - কার্লোস্ বিলার্দো।

বিলার্দো বিশ্বফুট্‌বলে যেই কৌশলকে জনপ্রিয়; এবং সম্ভবতঃ প্রবর্ত্তন; করেছিলেন, ফুট্‌বল্-কৌশলের ইতিহাস বেয়ে খেলাটির জন্মলগ্নে পৌঁছে গেলে সেই কৌশলের তাৎপর্য্য হয়তো কিছুটা অনুমান করা যাবে।


মধ্যযুগের অবসানে যখন ইউরোপে আধুনিকতার নবারুণ দিকচক্রবালে উঁকি দিচ্ছেন, তখন সেই আলোয় দেখা গেল ধর্ম্মকর্ম্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি 'করেও মানুষের হাতে সময় থাকছে প্রচুর। সমাজব্যবস্থা পালটে গেছে, শান্তি এসেছে দেশে দেশে। কিন্তু, উগ্র ও কলহপ্রিয় যুবার তাহলে কী হবে? আগে তাদের শক্তিক্ষয়; এবং প্রাণনাশ; 'হত যুদ্ধক্ষেত্রে। এদিকে, যুদ্ধ কমে গেছে। যুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গিয়ে অত্যধিক সেনাসংখ্যার প্রয়োজনও কমে গেছে। তবে? যুবা, প্রধানতঃ, দূর্বৃত্তি শুরু করল।


যুদ্ধ ও পেশার প্রয়োজনে ছাড়া শারীরিক কসরৎ ইউরোপে গির্জ্জার তরফে কখনই নেকনজরে দেখা হয়নি। সরল ও নিষ্পাপ মনোরঞ্জনকে শয়তানের অস্ত্র মনে করা 'হত। কিন্তু, এবার, সমাজে শান্তিরক্ষার প্রয়োজনে শঠের দল ভোলবদল করল। খেলাধূলার মাধ্যমে শক্তিক্ষয়, ক্রমে ক্রমে, সমাজসিদ্ধ 'হতে শুরু করল। কালে কালে, গির্জ্জার পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট শিক্ষানিকেতনেও ছেলেদের খেলার ব্যবস্থা চালু 'হল।


এই যুগ পরিবর্ত্তনের সময়ে ইংলন্ড ও ফ্রান্সে বেশ কিছু আধুনিক খেলার প্রবর্ত্তন হয়। তারই একটি আমাদের অতিপ্রিয় ফুট্‌বল্।

জনশ্রুতি এই, যে কিছু স্কট্ জনজাতি তাদের পরাজিত শত্রুসৈন্যের মাথা কেটে সেই কাটা-মাথাকে বল্ হিসেবে ব্যবহার 'করে ফুট্‌বল্-খেলার একটি প্রাচীন সংস্করণ আবিষ্কার করেছিল।

এদিকে, একটি গোলককে পা' দিয়ে পিটিয়ে খেলার আরও প্রাচীন প্রমান চীনে পাওয়া যায়।

বিতর্ক ব্যতিরেকে দুইটি কথা নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা যায়:

এক, কোন' একটি গোলাকার বস্তুকে একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুঁড়ে, লাথি-মেরে, ঠেলে বা অন্য কোন' উপায়ে পাঠানোর খেলা মানবজাতি বহুকাল ধরেই খেলে আসছে এবং দুই, আধুনিক ফুট্‌বলের ক্রীড়াকৌশল ও নিয়মাবলী ইউরোপীয় আধুনিক যুগের ঊষালগ্নে ইংলন্ডে বিবর্তিত হয়েছে।


নিশ্চিৎ হওয়া যায় আরও দুইটি বিষয় সম্মন্ধে:

প্রথম; আধুনিক ফুট্‌বল্ ও রাগ্‌বির উৎস্য এক এবং দ্বিতীয়; কেম্‌ব্রিজ্ ও রাগ্‌বি, এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা না থাকলে আজ ফুট্‌বল্ একটি স্বতন্ত্র খেলা 'হয়ে উঠত না!


সর্ব্বজনীন নিয়মাবলীর প্রবর্ত্তন হওয়ার আগে, যেই প্রতিষ্ঠানে খেলা হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে খেলাই ছিল চল। এতে, অবশ্যই, তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি 'হত। তাই, কেম্‌ব্রিজ্, রাগ্‌বি, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রাচীনতম কয়েকটি ফুট্‌বল্ ক্লাব্ বারংবার বৈঠক করতে শুরু করল খেলার নিয়ম বিধিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে।

একাধিক অধিবেশনের মাধ্যমে, প্রচুর আপোস 'করে, কিছু সঙ্গত নিয়মাবলী সৃষ্টি 'হল। কিন্তু, একটি বিষয়ের বৈধতা নিয়ে বাঁধল গোল - ইংরাজিতে তার নাম "হ্যাকিং"।

অধুনা এই শব্দের জনপ্রিয় অর্থে পরিবর্ত্তন ঘটেছে বটে, কিন্তু পুরাতন অর্থ একই রয়ে গেছে - গাছ; বা গাছের শাখা; কেটে ফেলা।

মার্কিন ফুট্‌বল্, রাগ্‌বি, অস্ট্রেলীয় ফুট্‌বল্ ইত্যাদি খেলায় আজও একধরনের ট্যাক্‌ল্ দেখা যায়, যেখানে কোনো একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের আক্রমণরত খেলোয়াড়ের পা' জড়িয়ে 'ধরে তাকে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে বাধ্য করে। এই হুমড়ি খেয়ে পড়াটা অনেকটা খাড়া গাছ কাটার পর সেটির পতনের মতন দেখতে লাগে 'বলে একে; খেলায়; হ্যাকিং বলা 'হত।


ফুট্‌বল্ খেলায় হ্যাকিং বৈধ হবে না অবৈধ হবে, অসংখ্য অধিবেশনের পরেও এই বিষয়ে কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছানো গেল না। আশ্চর্য্যের কথা, ফুট্‌বল্ খেলায় হাতের ব্যবহার নিয়ে কিন্তু তেমন অনৈক্য দেখা দেয়নি - দুই তরফই হাতের ব্যবহার বৈধ রাখার সপক্ষে ছিল!

কিন্তু, হ্যাকিং সংক্রান্ত মতপার্থক্যে খেলাটির দুইটি ভিন্ন রূপ সৃষ্টি হল: একটির নাম হ'ল "রাগ্‌বি রুল্‌স্ ফুট্‌বল্", যাতে হ্যাকিং বৈধ; আর দ্বিতীয়টির নাম "কেম্‌ব্রিজ্ রুল্‌স্ ফুট্‌বল্" থেকে, কালক্রমে, হ'ল "অ্যাসোসিয়েশন্ ফুট্‌বল্", যাতে হ্যাকিং 'হয়ে গেল অবৈধ। সময়ের সাথে সাথে রাগ্‌বি রুল্‌স্ ফুট্‌বল্ আধুনিক রাগ্‌বি, মার্কিন ফুট্‌বল্ ও অস্ট্রেলীয় ফুট্‌বলের জন্ম দিল আর অ্যাসোসিয়েশন্ ফুট্‌বল্ বিশ্বজুড়ে শুধুমাত্র "ফুট্‌বল্" নামে পরিচিত 'হল।





 
 
 

Comments


Post: Blog2_Post

Contact

+39308376232

©2019 by A Poetic Turn. Proudly created with Wix.com

bottom of page